যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বাইরে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন মানুষ ওজন কমানোর ইনজেকশন ব্যবহার করছেন। এই ঔষধগুলো GLP‑1 হরমোনের কার্যকলাপ অনুকরণ করে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওজন হ্রাসের নতুন উপায় হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহার ও বন্ধ করার পরিণতি সম্পর্কে এখনো স্পষ্ট তথ্য নেই।
GLP‑1 (গ্লুকাগন‑সদৃশ পেপটাইড‑১) একটি স্বাভাবিক হরমোন, যা খাবারের পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমাতে এবং তৃপ্তি বাড়াতে কাজ করে। এই হরমোনের অনুকরণকারী ইনজেকশনগুলো রক্তে ইনসুলিনের নিঃসরণ বাড়ায় এবং মস্তিষ্কে ক্ষুধার সংকেত দমন করে, ফলে রোগীরা কম খাবার খেয়ে ওজন কমাতে পারেন।
বাজারে Wegovy, Ozempic ইত্যাদি ব্র্যান্ডের ইনজেকশনগুলো প্রায়ই মাসিক বা সাপ্তাহিক ডোজে প্রদান করা হয়। যুক্তরাজ্যে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন মানুষ এই ঔষধগুলোকে ব্যক্তিগতভাবে ক্রয় করে ব্যবহার করছেন, যা মাসিক কয়েকশো পাউন্ডের খরচের সমান। তাই দীর্ঘ সময়ের জন্য এই থেরাপি চালিয়ে যাওয়া আর্থিকভাবে চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, GLP‑1 ইনজেকশনের দীর্ঘমেয়াদী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণভাবে বোঝা যায়নি। কিছু রোগীর মধ্যে হজমজনিত সমস্যা, মাথাব্যথা, ঘুমের ব্যাঘাত এবং ত্বকের পরিবর্তন দেখা গেছে, তবে এসবের প্রভাব কতটা স্থায়ী হবে তা এখনো গবেষণার বিষয়।
ইনজেকশন বন্ধ করার পর বেশিরভাগ ব্যবহারকারী তীব্র ক্ষুধা ও অতিরিক্ত খাবারের আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেন। একে প্রায় “হাঁসের কণ্ঠে ফিরে যাওয়া” হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যেখানে খাবারের গন্ধ ও দৃশ্যই তৎক্ষণাৎ তৃপ্তি বাড়ায়। এই অবস্থায় ওজন পুনরুদ্ধার দ্রুত হতে পারে।
তানিয়া হল, একজন বড় ফিটনেস কোম্পানির সেলস ম্যানেজার, ওজন কমানোর ইনজেকশন ব্যবহার করার প্রধান কারণ ছিল পেশাগত স্বীকৃতি অর্জন। তিনি নিজেকে অতিরিক্ত ওজনের কারণে শিল্পে অবহেলিত মনে করতেন এবং slimmer হওয়া মানে অধিক সম্মান পাবে বলে বিশ্বাস করতেন।
ইনজেকশন শুরু করার পর তানিয়ার ওজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং সহকর্মীদের প্রশংসা পেতে শুরু করেন। তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং কাজের পরিবেশে তিনি অধিক স্বীকৃতি পান। তবে এই সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শারীরিক অস্বস্তি অনুভব করতে শুরু করেন।
প্রাথমিক কয়েক মাসে তানিয়া ঘুমের ব্যাঘাত, বারবার বমি বমি ভাব, মাথাব্যথা এবং চুল পড়ার সমস্যার সম্মুখীন হন। যদিও চুল পড়া সরাসরি ঔষধের কারণ না-ও হতে পারে, তবে এটি সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এসব উপসর্গ তাকে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করতে বাধ্য করে।
ইনজেকশন বন্ধ করার সময় তানিয়া বর্ণনা করেন, “মনের মধ্যে যেন একটা দরজা খুলে যায়, যা বলে—‘সব খাবার খাও, তুমি দীর্ঘ সময় কিছুই খাওনি’।” এই অনুভূতি তাকে অতিরিক্ত খাবার গ্রহণে প্রলুব্ধ করে এবং ওজন পুনরুদ্ধার দ্রুত ঘটে।
অন্য একজন ব্যবহারকারী, যিনি নাম প্রকাশ না করে গোপনীয়তা বজায় রেখেছেন, তানিয়ার মতোই একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি ইনজেকশন বন্ধ করার পর প্রথম কয়েক দিনই তীব্র ক্ষুধা ও খাবারের প্রতি অপ্রতিরোধ্য আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেন, যা তার দৈনন্দিন রুটিনকে ব্যাহত করে। তার মতে, কোনো পরিকল্পনা ছাড়া থেরাপি বন্ধ করা ঝুঁকিপূর্ণ।
এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, ওজন কমানোর ইনজেকশন দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যবহার করা হলে আর্থিক ও শারীরিক দু’ধরনের বোঝা বাড়ে, এবং বন্ধ করার সময় যথাযথ সমর্থন ছাড়া রোগীর উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। তাই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ডোজ ধীরে ধীরে কমানো এবং পুষ্টি পরিকল্পনা তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন যে, ইনজেকশন বন্ধ করার আগে রোগীকে বিকল্প ডায়েট, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মানসিক সমর্থন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। স্বল্পমেয়াদে ওজন বজায় রাখতে জীবনধারার পরিবর্তন অপরিহার্য, আর কোনো স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তের আগে চিকিৎসা পরামর্শ নেওয়া উচিত।



