গ্রিসের উপকূলরক্ষী বাহিনী শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) ক্রিট দ্বীপের দক্ষিণে একটি মাছ ধরার নৌকা থেকে প্রায় ৫৪০ আশ্রয়প্রার্থীর জীবন রক্ষা করেছে। তল্লাশি অভিযান চলাকালে গাভডোস থেকে প্রায় ১৬ নটিক্যাল মাইল দূরে নৌকাটি ধরা পড়ে এবং তৎক্ষণাৎ উদ্ধার কাজ শুরু হয়। এই ঘটনার ফলে গ্রীসের সীমান্তে মানবিক সংকটের নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে।
কোস্টগার্ডের একটি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, উদ্ধারকৃত নৌকাটি কোথা থেকে যাত্রা করেছিল তা স্পষ্ট করা হয়েছে, যদিও নৌকার মূল গন্তব্য সম্পর্কে তথ্য এখনও অজানা। নৌকাটি ছিল একটি পুরনো মাছ ধরার জাহাজ, যা অল্প সময়ের জন্য অভিবাসীদের বহন করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। উদ্ধারকর্মীরা নৌকার তলদেশে সাঁতার কেটে আটকে থাকা মানুষদের নিরাপদে তোলেন।
অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিশর, ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া, সুদান এবং ফিলিস্তিনের নাগরিক অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। প্রতিটি দেশের নাগরিকের সংখ্যা ভিন্ন হলেও মোট সংখ্যা প্রায় ৫৪০ হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। এই জাতিগত বৈচিত্র্য গ্রীসের সাম্প্রতিক সমুদ্র পারাপার ঘটনার বৈশিষ্ট্যকে প্রতিফলিত করে।
উদ্ধারকৃতদের রেথিমনোর ক্রিটান শহরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যেখানে তারা তৎক্ষণাৎ স্বাস্থ্য পরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসা এবং কোভিড-১৯ স্ক্রিনিং সম্পন্ন হওয়ার পর, তাদেরকে আশ্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। গ্রীসের অভিবাসন বিভাগ এই প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করার জন্য বিশেষ দল গঠন করেছে।
কোস্টগার্ডের মুখপাত্র এএফপি-কে জানিয়েছেন, উদ্ধারকৃতদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের মানবিক অধিকার রক্ষা করা গ্রীসের অগ্রাধিকার। তিনি আরও উল্লেখ করেন, গ্রীসের সীমান্ত রক্ষাকারী সংস্থা আন্তর্জাতিক নীতি অনুসারে কাজ করছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থন প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
মেডিটেরেনিয়ান সাগরে সাম্প্রতিক মাসে অভিবাসী নৌকা ডুবে যাওয়ার ঘটনা বাড়ার ফলে গ্রীসের সমুদ্র রক্ষাকারী বাহিনীর কাজের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের শরণার্থী নীতি অনুযায়ী, গ্রীসকে প্রথম গন্তব্য দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, ফলে এখানে বড় পরিমাণে মানুষ পৌঁছায়।
ইউরোপীয় শরণার্থী সংস্থা (ইইএস) গত সপ্তাহে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, গ্রীসের তীরবর্তী দেশগুলোতে শরণার্থী গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত এবং অতিরিক্ত সহায়তা প্রয়োজন। এই রিপোর্টে গ্রীসের সরকারকে আন্তর্জাতিক সমর্থন বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও গ্রীসে থাকা দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মন্ত্রক একটি বিবৃতি জারি করে বলেছে, বাংলাদেশি নাগরিকদের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া হচ্ছে এবং তাদেরকে দ্রুত শরণার্থী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সহায়তা করা হবে।
পাকিস্তান, মিশর এবং অন্যান্য দেশের দূতাবাসও গ্রীসের সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের নাগরিকদের জন্য কূটনৈতিক সহায়তা প্রদান করছে। এই ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগ শরণার্থী সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বকে তুলে ধরে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, ভূমধ্যসাগরে অভিবাসী রুটের পরিবর্তন এবং গ্রীসের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে। একটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক বলেন, গ্রীসের কৌশলগত অবস্থান তাকে ইউরোপীয় শরণার্থী প্রবাহের গেটওয়ে করে তুলেছে।
অতীতের তুলনায়, এই উদ্ধার কাজের পরিমাণ পূর্বের কোনো ঘটনাকে ছাড়িয়ে গেছে। নভেম্বর মাসে লিবিয়ায় নৌকা ডুবে যাওয়ায় ১৮ জনের মৃত্যু ঘটলেও, এইবার গ্রীসের কোস্টগার্ড দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে বড় সংখ্যক মানুষকে রক্ষা করেছে।
গ্রীসের সরকার এই ধরনের মানবিক সংকট মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তা চেয়েছে। গ্রীসের অর্থ মন্ত্রণালয় একটি প্রেস রিলিজে উল্লেখ করেছে, শরণার্থী সংখ্যালঘুদের জন্য অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ করা হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের শরণার্থী ও অভিবাসন নীতি সমন্বয় কমিটি (ইএমসিএ) এই ঘটনার পর গ্রীসের সঙ্গে পরামর্শ সভা আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে। এই সভায় গ্রীসের সীমান্ত রক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত নৌকা ও সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয় আলোচনা হবে।
গ্রীসের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশেও এই ঘটনা প্রভাব ফেলতে পারে। সরকারী দলগুলো শরণার্থী নীতি নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত, যেখানে কিছু দল কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের পক্ষে এবং অন্যরা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সহায়তার আহ্বান জানায়।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে, গ্রীসের সমুদ্র রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে ত্রুটি না থাকলে ভবিষ্যতে অনুরূপ মানবিক বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব হবে। একটি নিরাপত্তা বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, সমুদ্র রক্ষাকারী বাহিনীর আধুনিকীকরণ এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় এই ধরনের ঘটনার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রীসের রেথিমনো শহরে শরণার্থী নিবন্ধন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও সহায়তা প্রদান করবে। এই কেন্দ্রগুলোতে ভাষা শিক্ষা, মানসিক পরামর্শ এবং কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
উদ্ধারকৃতদের মধ্যে বেশিরভাগই তরুণ প্রাপ্তবয়স্ক, যারা কর্মসংস্থান ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ খোঁজার জন্য এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা বেছে নিয়েছেন। তাদের জন্য গ্রীসের শরণার্থী নীতি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গ্রীসের সরকার ভবিষ্যতে সমুদ্র পারাপার রুটের পর্যবেক্ষণ বাড়াতে ড্রোন ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছে। এই প্রযুক্তি নৌকা ডুবে যাওয়া এবং মানবিক সংকটের পূর্বাভাসে সহায়তা করবে।
শেষে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা গ্রীসের মতো সীমান্ত দেশগুলোর জন্য শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় অপরিহার্য। এই ধরনের মানবিক উদ্ধার কাজ কেবল জীবন রক্ষা করে না, বরং আন্তর্জাতিক নীতির বাস্তবায়নে নতুন দিক নির্দেশ করে।



